ঘুড়ি তুমি কার আকাশে ওড়ো

জনপ্রিয় এই গানটি  বর্তমান জেনারেশনের ছেলেমেয়েদের খুবই পছন্দের একটা গান। অতীত হয়ে যাওয়া প্রিয়ার জন্য মনের যে করুন আকুতি মূলত তাই ফুটিয়ে তুলেছেন গায়ক লুৎফর হাসান তার এই গানের কথামালা গুলিতে।

যাই হোক, জনপ্রিয় এই গানের পংক্তি মালা নিয়ে আমার বিশ্লেষণ কিন্তু পুরোপুরি ভিন্ন।

এই কথামালা গুলোই যদি ধর্মীয় দিক থেকে আমি বিবেচনা করি, তাহলে অনেকগুলো প্রশ্ন আমার মনের মধ্যে উঁকিঝুঁকি দিতে থাকে।

যেমন নিচের প্রশ্নগুলো যদি আমি করি, পাঠক হিসেবে আপনাদের মতামত গুলো কেমন হতে পারে?

প্রশ্নমালা একঃ

আকাশ টা কার? এই আকাশের মালিক কে? ঘুড়ি উড়াতে যে বাতাস লাগে সেই বাতাসের সৃষ্টিকারী কে?

এই আকাশ বাতাস, দুনিয়া, দুনিয়ার বাইরে দুনিয়া, গ্রহ নক্ষত্র,সৌরজগৎ, মানুষের চোখে দৃশ্যমান অদৃশ্যমান সমস্ত জিনিস আল্লাহপাক রাব্বুল আলামিন নিজে সৃষ্টি করেছেন।এইজন্যই আল্লাহপাক এই সমস্ত কিছুর মালিক।আল্লাহপাক বিভিন্ন জীবজন্তু সৃষ্টি করেছেন, তার মধ্যে মানুষকে করেছেন সবচাইতে সেরা। মানুষ হলো আশরাফুল মাখলুকাত,  যাদের সেবা করার প্রয়াসে আল্লাহপাক বাকী সবকিছু সৃষ্টি করেছেন।

এই দুনিয়ার সবকিছুই আল্লাহপাকের নির্দেশ অনুযায়ী চলে। শুধু মানুষ নয়, আল্লাহর সৃষ্টির কারুরই সাধ্য নেই আল্লাহর ইশারা ছাড়া কোন কিছু করার।

এই দুনিয়ার মালিক আল্লাহ তায়ালা। দুনিয়ার মানুষ আমরা চলি আল্লাহর নির্দেশে। এবং আমাদের মানুষদের এই দুনিয়াতে চলার জন্য যা কিছু দরকার, সবই আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য সৃষ্টি করে দিয়েছেন।

লাহু মা ফিস সামাওয়াতি ওয়া মা ফিল আরদি অর্থাৎ আসমান ও জমিনের মধ্যে যা কিছু রয়েছে সে সবই আল্লাহর মালিকানাধীন।’ তিনি স্বয়ং সম্পন্ন ইচ্ছা শক্তির মালিক। যেভাবে যাকে ইচ্ছা তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।

প্রশ্নমালা দুইঃ

ঘুড়ি কি আমি উড়াই- আমার কি সেই সক্ষমতা আছে? কে আমাকে দিয়ে এই নানান রং এর ঘুড়ি উড়ায়- তাকে কেন আমি দেখি না।

মানুষ সহ এ দুনিয়ার সকল প্রাণী কুল,  জড় বস্তু আকাশ বাতাস নদী সাগর পাহাড়পর্বত সৃষ্টি করেছেন মহান রাব্বুল আলামিন। আমরা সবাই হলাম আল্লাহ পাকের বান্দা বান্দি। আল্লাহ পাক আমাদের সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তার আনুগত্য প্রকাশ করে তার ইবাদত বন্দেগীতে জীবন অতিবাহিত করার জন্য।

অনেকে ভাবতে পারে, আমি মানুষ, সৃষ্টির সেরা জীব আশরাফুল মাখলুকাত। আমি আমার মতন চলবো, যা ইচ্ছা করবো। আমি মুক্ত, আমি স্বাধীন।

ঠিক আছে, আপনার চিন্তাকে আমি অবশ্যই শ্রদ্ধা করি। কিন্তু আপনাকে আগে আমার একটা প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। আপনি যেহেতু সৃষ্টির সেরা জীব বলে নিজের ইচ্ছায় নিজের জীবন পরিচালিত করার কথা ভাবছেন, আপনি কি তাহলে নিজের ইচ্ছায় বাঁচতে বা মরতে পারবেন?

শুনুন, এক আল্লাহ তা’য়ালার ইশারা ছাড়া গাছের পাতা ও নড়ে না। আমি আপনি তো তুচ্ছ এখানে।

পুরান ঢাকার সাকরাইন বা ঘুড়ি উৎসব

এই যে পৌষ সংক্রান্তি বলেন, আর সাকরাইন উৎসবই বলেন, আকাশে যে নানা রকমের ঘুড়ি উড়তে থাকে। এসব ঘুড়ি কে উড়ায়? আমার আপনার মতন মানুষ। ওকে, আল্লাহ যদি এই মুহুর্তে এক ইশারা দেয়-এই ঘুড়িরা, তোরা আর কেউ উড়বি না।তাহলে আপনি মানুষ যতই সৃষ্টির সেরা জীব হোন, পারবেন আর ওই ঘুড়ি উড়াতে? না পারবেন না। কেন পারবেন না জানেন? কারন আমরা যাই করি, ঘুড়ি উড়াই আর অন্য কাজ, আল্লাহর ইশারা ছাড়া সব অসম্ভব।

আল্লাহর ক্ষমতা কত বড়, কত মহান এটা বোঝার জন্য বেশী দুর যাওয়ার দরকার নেই। এই করোনা পরিস্থিতিটাই একটু বোঝার চেষ্টা করেন। ইউরোপ আমেরিকার মতন বড় বড় রাষ্ট্র, কত তাদের পাওয়ার সব ধুলিস্মাত হয়ে গেছে করোনা নামক এক মাইক্রোস্কোপিক ভাইরাসের কাছে।

সেদিন দেখলাম, পাকিস্তানের বিখ্যাত ক্রিকেটার শোয়েব মালিক ও বললেন-

‘দেখেন এসবই আল্লাহর ক্ষমতা। আর আল্লাহ কীভাবে নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ করলেন। এসব আসলেই আল্লাহরই ইচ্ছা। মানুষের বোঝা উচিত যে আল্লাহর ক্ষমতা কত বড়; যে কিছু সময়ের মধ্যেই সবকিছু বন্ধ হয়ে গেছে।’

এখন অনেকেই বলতে পারেন, আল্লাহর এতো ক্ষমতা,  আল্লাহর আদেশ ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না। তাহলে উনাকে কেউ দেখে না কেন?

প্রশ্নের উত্তর এবার আমি প্রশ্ন দিয়েই দিই। আপনি একজন মানুষ। রাইট? ওকে ফাইন। আপনি একজন মানুষ হয়ে বড় জোর আপনার এলাকা, আপনার শহর অথবা আপনার দেশ দেখেছেন। আবার হয়তো আপনি আপনার দেশ ছাড়াও অন্য কোন দেশ ও দেখেছেন। তো আপনি এতো সক্ষম মানুষ হয়ে এই মহাবিশ্বের পুরোটা দেখতে পারলেন না? মহাবিশ্ব মানে বুঝেছেন তো? এই দুনিয়া নামক গ্রহ, আরো এরকম অন্যান্য গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র টোটাল সৌরজগৎ। দেখেছেন এই মহাবিশ্বের অন্তর্ভুক্ত এই সব অংশ গুলো?

কি অসম্ভব মনে হচ্ছে? নিজেকে মহাবিশ্বের তুলনায় খুব ক্ষুদ্র মনে হচ্ছে? এইবার বোঝেন, কেন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কে আপনি দেখতে পাননা। যে আল্লাহর সৃষ্টি মহাবিশ্বের কয়েক কোটি ভাগের একভাগ দেখার যোগ্যতাও আপনার নেই, সেই মহাবিশ্বের খোদ সৃষ্টিকর্তাকে দেখার যোগ্যতা আপনার আছে এটা ভাবেন কোন  সাহসে!

পেয়েছেন এবার জবাব!

প্রশ্নমালা তিনঃ

এই বিস্তীর্ণ আকাশ, আসমান  জমিনের মাঝে এই অফুরান বাতাসের মালিক কে, এই আকাশের পরে কি আরেক টা আকাশ আছে, সেখানে কি ঘুড়ি উড়ে? সেই ঘুড়ি আমি কেন দেখি না!

পবিত্র কোরআন শরীফের সূরা আল-বাকারাহ’র ২৯ নম্বর আয়াতে  বলা হয়েছে-

“পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। এরপর তিনি আকাশের দিকে মনোযোগ দেন এবং তা সপ্ত আকাশে বিন্যস্ত করেন। তিনি সব বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।” (২:২৯)

আমাদের এই পৃথিবীর বহিস্তরে যে আকাশ আমরা দেখি সেটা ছাড়াও এই মহাবিশ্বের আরো আকাশ রয়েছে। পর্যায়ক্রমে এই আকাশ  একে একে সপ্ত আকাশের স্তর হিসেবে সুন্দর ভাবে এই মহাবিশ্বে বিন্যাস হয়ে রয়েছে।

এখন আপনি বলতে পারেন,এই আকাশের পরে আরো যে আকাশ আছে, সেখানে কি আমি ঘুড়ি উড়াতে পারবো? সেই আকাশ কি আমি দেখতে পাবো? হ্যাঁ দেখতে পাবেন, যতটুকু আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আপনাকে দেখার অনুমতি দিয়েছেন।

এই মহাজগৎ এর কোটি কোটি গ্রহ, নক্ষত্র,  জ্যোতিষ্কমণ্ডলি এসব এর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ এখনো বিজ্ঞানীরা পুরোপুরি আবিষ্কার করতে পারেন নি। যুগের পর যুগ ধরে বিজ্ঞানীরা এই মহজগতের সপ্ত আকাশ, বিভিন্ন আকাশের স্তরের মধ্যবর্তী উপাদানগুলো বের করার জন্য প্রাণান্তিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত যতটুকু তারা সফল হয়েছেন তা অতীব সামান্য,  ধরতে গেলে অনু পরিমাণ এর চেয়েও কম।

তো এই আমাদের দুনিয়ার আকাশ ছেড়েও অন্য যে আকাশগুলো আছে, সবগুলো আকাশে আমাদের মানুষের কোন এক্সেস আল্লাহ রাব্বুল আলামিন দেন নাই।

এজন্যই আমরা জানিনা ওইসব আকাশে আল্লাহপাক কি চমৎকার কারসাজি করে রেখেছেন। তবে যে আকাশেই হোক না কেন, সেখানকার সৃষ্ট যা আছে তা অবশ্যই আল্লাহপাকের ইশারা ছাড়া একবিন্দু নড়ার কোন ক্ষমতা রাখে না। আর তাই আমি মানুষ অন্য আকাশে কি হয় (রুপক অর্থে ঘুড়ি উড়ানো) এটা জানার কোন নির্দেশ ও আল্লাহ্ পাক দেন নাই।

আপনি হয়তো ভাবছেন কোন গানের কি ব্যাখা  আমি দিলাম। তাই ভাবছেন কি? ভাবনার বেড়া জালে আমি যদিও হারিয়ে গেছি তবুও কথাগুলো কিন্তু একেবারে আপনি ফেলে দিতে পারবেন না।

এই আকাশ বাতাস, মাটি পানি পাহাড় পর্বত সব সৃষ্টি করেছেন এক আল্লাহ তা’য়ালা। তার ইশারাতেই আমরা মানুষ ঘুড়ি হয়ে তার দুনিয়ায় চলি। কাজেই আপনি আমি যদি একটু বেশী বাতাস পেয়ে একেবারে পতপত করে উড়তে উড়তে এই আকাশের দুর সীমানায় যেতে চাই, আপনি বা আমি যেতে পারবো কিনা, বা কতদূর যেতে পারবো সব ক্ষমতা কিন্তু ঘুরেফিরে সেই আল্লাহ পাকের হাতে। তিনি লাটাই নামক কন্ট্রোলার দিয়ে আমাদের সবার সকল গতিবিধি, কার্যক্রম ইত্যাদি কন্ট্রোল করেন। আর যখনি তিনি ইচ্ছা করেন, এক সেকেন্ডের মধ্যে লাটাইয়ের সুতোয় এমন টান দেন,  মানুষের কি সাধ্য সে টান উপেক্ষা করার।

Click Here to Leave a Comment Below 0 comments

Leave a Reply:

Facebook43
Pinterest27
Instagram
Open chat
1
আমার সাথে যোগাযোগ করার জন্য ধন্যবাদ।