• Home
  • Blog

পৃথিবীতে অনেক খারাপ মানুষ আছে, কিন্তুএকটাও খারাপ বাবা নেই, কেন?

পৃথিবীর সব বাবাই হচ্ছে নিঃসঙ্গ শেরপা যে একাই লড়াই করে পরিবারের সবাই কে ভালো রাখার জন্য। আর সন্তানের জন্য বাবা হলো  বাতিঘর। সেই বাতিঘর যে সন্তান কে অন্ধকার থেকে আলোয় পথ দেখায়।

বাবা নামের বটগাছ যার মাথার উপর নেই, সেই বুঝে রোদের তাপ কতটা প্রখর! বাবা তোমার স্মৃতিগুলো মনে করতে চাই না, জানো? স্বার্থপর হতে খুব ভালো লাগে। ভুলে গিয়ে বেশ আছি। তবুও কিছু স্মৃতি মনে পড়ে যায় অচিরেই।

বাবা মানেই যেন দূরের কেউ। শাসন মাখা গম্ভীর মুখো একজন। যে কিনা শুধুই বকতে জানে। রাগ দেখাতে পারে। বাবার সাথে হাসির স্মৃতি হাতে গোনা কয়েকটি। ডায়েরি লেখলেও দু’পাতার বেশি হবে না। খুব কষ্টে মনে করতে হবে শেষ কবে বাবা গল্প করতে কাছে ডেকেছেন। এই জন্যেই বোধ হয় কবিতা, ইতিহাস, গল্পেও বাবাদের নিয়ে তেমন আদিখ্যেতা দেখা যায় না। বাবা দিবস ছাড়া যেন বাবাদের নিয়ে লেখার আর কোন কিছু থাকে না। তাই জীবনে বাবাদের গুরুত্ব অনেকটাই অপ্রাকাশিত থেকে যায়। ঠিক যেমন রয়ে যায় বাবাদের আবেগগুলোও। আচ্ছা বাবারা আসলে কি ভাবেন বলুন তো? নিজের জন্ম দেয়া সন্তানের সাথে কথা বলতে এতো কেন সংশয় তাদের? কেন বলতে পারে না "তোকে খুব ভালবাসি সোনা।"

বাবা হলো সেই বাতিঘর যে সন্তান কে অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখায়

বাবা হলো সেই বাতিঘর যে সন্তান কে অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখায়

আসলে বাবারা কেমন হয়...? 

বাবারা আসলেই কথায় পটু হয় না। শিখেনি মনের কথা ভাগাভাগি করে নিতে। অনুভূতির সত্যিকারের মর্যাদা যে তার প্রকাশে, বাবারা সেটা জানেই না। “আজ শরীরটা ভাল লাগছে না”, “আমার খুব কষ্ট হচ্ছে”, “আমি এইবার পারবো না”, “সমস্যায় পড়েছি”- ছোট ছোট এই বাক্যগুলোকে প্রকাশ করতে পারে না। উল্টো পাহাড় বানিয়ে নিজের আত্মার ভার বাড়ায়। কিন্তু জানেন কি, স্বল্পভাষী এই বাবারাই কলিগদের কান ঝালাপালা করে সন্তানদের নিয়ে গল্প করে। অথচ সন্তানদের সামনে নিজেকে একদম জাহির করবে না।

‘আয় রে আমার কাছে আয় মামণি..’ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের আদরমাখা এই গান সকল যুগের সকল  বাবা-সন্তানের ভালোবাসার দৃঢ়তাকে প্রকাশ করে। বাবাকে সব সময় কাছে না পেলেও, সন্তানের মন কাঁদে বাবার জন্য। বাবার প্রিয় সন্তান হয়ে ওঠার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয় মনের ভেতরে। ‘মনে হয় বাবা যদি বলতো আমায়,আয় খুকু আয়’- লাইন দুটো বাবার আদরের কাঙ্গাল সেসব সন্তানদের ব্যকুলতাই প্রকাশ করে।

সাধারণ অর্থে জন্মদাতাকে বাবা বলার রেওয়াজ আমাদের। তবে আমি মনে করি, বাবা একটি অনুভূতি। পিতৃত্ববোধের মধ্য দিয়ে যার সূচনা। মায়ের সাথে নাড়ির সম্পর্ক, তো বাবার সাথে  নির্ভরতার। মায়ের মন সন্তানের আগাম বিপদের সংকেত শুনতে পায়। আর বাবা অজানা সকল বিপদের বিপক্ষে বিরতিহীন ভাবে প্রস্তুতি নিতে থাকে। তারপর একদিন শৈশবের ভয়ার্তক হুঙ্কারই হয়ে ওঠে আমাদের সাহসের ঢাল।

শ্রাস্ত্রে বলা হয় “পিতাই স্বর্গ, পিতাই ধর্ম এবং পিতাই তপস্যা”। অর্থাৎ পিতা প্রসন্ন হলে দেবতাও প্রীত হোন। তাই সন্তানের জন্যে বাবার প্রার্থনা কখনো বিফলে যায় না। বাবার চোখের অশ্রু সৃষ্টিকর্তার মেহেরবানীর বর্ষা হয়ে সন্তানের জীবনকে উর্বর বানায়। বাঁধ ভাঙে রহমতের ধারায়। এই কারণেই সম্রাট বাবরের মতো বাবারা অমরত্ব লাভ করে সন্তানের প্রাণে।

সম্রাট বাবর ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। অদম্য সাহস ও বীরত্ব যার অপর নাম। সেই সম্রাটও একদিন ভিখারির মতো হাত পেতে ছিলেন। প্রিয় সন্তানের জীবন ছিনিয়ে আনতে যমদূতের সাথে লড়াই করেছেন। কঠিন রোগে শয্যাশায়ী হুমায়ূনের প্রাণের আশা যখন বিজ্ঞ বৈদ্যরাও ছেড়ে দেন তখনও হাল ছাড়েননি স্নেহময় বাবা বাবর। আল্লাহর দরবারে নিজের প্রাণকে উপস্থিত করেন পুত্রের প্রাণের বিনিময়ে। সেই মোনাজাতের শক্তি বা আকুলতা একমাত্র অবিনশ্বরই জেনে থাকবেন। কারণ বাবরের শরীরে একেক করে রোগের লক্ষণ দেখা দিতে লাগলো এবং অন্যদিকে পুত্র হুমায়ূন আরোগ্য লাভ করতে থাকে। এভাবেই একজন বাবা স্বচ্ছায় মৃত্যুপুরীর যাত্রা করেন সন্তানের জীবন ফিরিয়ে দিতে। 

বাবা ও সন্তান

এই জগতে পিতা-কন্যার সম্পর্ক আরেক লোভনীয় দর্শন। এর মতো নির্মল,পবিত্র আর কিছুই নেই। একজন কন্যার চোখে পিতা তার জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরুষ। পিতার আলিঙ্গনে কন্যা স্নেহ, নির্ভরতা ও নিরাপত্তার উষ্ণতা খুঁজে পায়। পিতা যে তাকে জীবনের কোন বাঁকেই একলা ছেড়ে যাবেন না, তা কন্যা ঠিক উপলব্ধি করতে পারে। এজন্যই হয়তো ‘বাবা দিবস’র প্রচলনটি এক তরুণীর মাথায় আসে। সেও নির্ঘাত কোন বাবার রাজকন্যা। অভিজ্ঞরা বলেন, কন্যারা নাকি তার পুরুষের মাঝে পিতার ছাপ খুঁজে পায়। আসলে আমরা সবাই প্রচন্ড রকম বাবা ভক্ত। “বাবা” শুধুমাত্র শ্রুতিমধুর একটি ডাক নয়। বাবা মানে বিশালত্বের এক অপার ভান্ডার। নিজে জ্বলে সন্তানদের জীবনকে আলোকিত করে একজন বাবা। ছাদ হয়ে তপ্ত গরমে পুড়ে, ছায়া দিয়ে যায় সবাইকে। বাবারা সেই বটবৃক্ষ, যে মাথার উপর দাঁড়িয়ে থাকে ভিত হয়ে। বাবাদের ভালবাসা মাকড়সার জ্বালের মতোই আমাদের আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে রাখে। নির্ভহীক নাবিকের মতোই আগলে রাখে সারাক্ষণ।

[বাবাদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর আত্মত্যাগের জন্য বাবা দিবসটির জন্ম হয় ১৯১০ সালে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৮৭টি দেশে বাবা দিবস পালিত হয়। যার মাঝে ৫২টি দেশ এই দিবস পালন করে জুনের তৃতীয় সপ্তাহে। বাংলাদেশ তাদের মধ্যে একটি।] 

সন্তানের জীবনের অনেকটা মাকে ঘিরে থাকলেও বাবার অনুপস্থিতি বিরাট শূণ্যাতার জন্ম দেয়। কথা সাহিত্যিক হূমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন- প্রথম সন্তান মা-বাবার কাছে জীবন্ত খেলনার মতো। খেলনা যখন হাসে মা-বাবা হাসে, খেলনা কাঁদলে মা-বাবা কাঁদে। এই কথার অর্থ হলো সন্তানকে ভালবাসা দিতে বাবা মা কেউই কার্পণ্য করে না। ভূমিষ্ট হওয়া সন্তানকে বুকে নেয়া মায়ের আবেগ যেমন মা ছাড়া আর কেউ বুঝে না। তেমনি সন্তানের প্রথম স্পর্শ বাবার কাছে বেহেশতি সুখের ন্যায়। আমি নিশ্চিত, একজন বাবাও সেই অনুভূতির বর্ণনা দিতে পারবে না।

আচ্ছা বাবাদের কাঁধ কি একটু বেশী চওড়া হয়? নাহলে সারা পৃথিবীর সমস্ত ভার ছোট্ট এই কাঁধ দুটোতে নেয় কীভাবে!

সেইদিন বাবা দিবসে বাবাদের নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। নানাজনের নানান মতামতে সেজে উঠেছিল আসর। মমতা মেশানো, ভেজা গলাগুলো স্মৃতির পাতা হাতড়ে বের করে একেক গল্প। কিন্তু আবেগের সেই মুখরিত সন্ধ্যা থমথমে হতে বেশী সময় নিলনা। কিছু নিষ্ঠুর সত্য, বীভৎস করে তুলেছিল শ্রদ্ধাভাজন মুখটিকে। রক্ষার হাতটি হয়ে উঠেছিল নোংরা থাবা। বাবা নামের পাশে ধর্ষক শব্দটি কানে আসতে লাগলো। শরীর গুলিয়ে এলো। মাথা ঘুরে আসতে লাগলো। তারপরও আমি দৃঢ় ভাবে বলেছিলাম বাবারা খারাপ হতেই পারে না।  -কেন?

[এই করোনা কালেই বাবা হয়ে কন্যা সন্তানকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে একাধিক। সেই অপ্রীতিকর ঘটনাগুলোর কোন প্রতিবাদ হয় না। এড়িয়ে যাওয়াও যায় না। ]

যেসব বাবাদের কথা পত্রিকার অপরাধ পাতায় ছাপা হয়, তাদের পিতৃত্ববোধ অনেক আগেই মৃত্যুবরণ করে। বাবার পবিত্র পদবীটাও আর তাদের খাটেনা। ফলে তাদের ঠিক বাবা বলা যায় না। বাবারা আঘাত করতে জানে না। সে তো নিজেকে মেরে সন্তানকে বাঁচায়। বাবারা বড় বড় কথার বুলি আওড়ায় না। বরং কোন মহেন্দ্রক্ষণেও সন্তানের হাত ছাড়ে না। বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে ফেলে আসা হাজারো কুলাঙ্গার যেমন সন্তান চরিত্রের ব্যাখ্যা দেয়না। তেমনি গোটা কয়েক বিকৃত মানসিকতার লোকেদের জন্য বাবারা খারাপ হয়ে যায় না।  

বাবা আমার বাবা

‘পৃথিবীতে অনেক খারাপ মানুষ আছেন, কিন্তু একটাও খারাপ বাবা নেই’- বিশিষ্ট্য কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের এই উক্তিটি সকল বাবা ভক্তদের মনকে সিক্ত করে। জানায় সন্তানের প্রতি বাবাদের অসীম স্নেহের কথা। সেই সাথে জানান দেয় ‘একজন বাবা’ শুধু জন্মদাতাই নয়, শ্রেষ্ট মানবদের একজনও।

বাবা আর সন্তানদের ভালবাসাটা একদম সত্যিকারের প্রেম। যেখানে কেউ কাউকে হারতে দেয় না। শত মনোমালিন্যের মাঝেও দুজনে একই দলের। বাবা-সন্তানের এই যুগলবন্দী, এই অনুভূতি পবিত্র এবং সত্য। যুগ যতই বদলাক বাবার হৃদয় সন্তানের জন্যই স্পন্দিত হবে। একইভাবে সন্তানের মন ছলকে উঠে বাবার আদর সোহাগ পেয়ে। আমি এমন বাবাদের কথাই মনে রাখতে চাই। আমরা শ্রদ্ধায় নত হতে চাই হেরে না যাওয়া সেসব বাবাদের মনে করে। প্রত্যাশা রাখি প্রতিটা সন্তানের চোখেও উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে জ্বলবে তার বাবার ছবি।

Click Here to Leave a Comment Below 0 comments

Leave a Reply:

Facebook43
Pinterest27
Instagram
Open chat
1
আমার সাথে যোগাযোগ করার জন্য ধন্যবাদ।